• ১৮ অক্টোবর ২০২১ ১৬:৩৯:৫২
  • ১৮ অক্টোবর ২০২১ ১৬:৩৯:৫২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নাগরিকের নিরাপত্তা, অনুভূতির আঘাত, ধর্ম ও বিভাজনের কূটকৌশল

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

কী লিখি, কেন লিখি, কত লিখি। এমন প্রশ্ন করছি নিজেকেই। নিজের অক্ষমতা, মেরুদণ্ডহীনতার লজ্জা নিয়ে তো আছি দীর্ঘদিন। নত হতে হতে নীত হয়েছে মাথা। আর কতো। এই যে, দেশে যা ঘটলো, একটা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের উৎসবের আনন্দকে আতঙ্কে পরিণত করা হলো। মারা গেলেন বেশ কয়েকজন মানুষ। কেউ প্রতিপক্ষের হাতে, কেউ পুলিশের গুলিতে। কেউ তাদের ভাগ করেন হিন্দু-মুসলিম বিভাজনে। আরে, আগে তো মানুষ পরে হিন্দু মুসলিম। 

কারা মারা যাচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন এই দেশের মানুষ। এই রাষ্ট্রের নাগরিক। যারা এই রাষ্ট্রটিকে গড়ে তুলেছিলেন তাদের নিজ নিরাপত্তার জন্য। রাষ্ট্র গড়ে ওঠার পেছনে যা কাজ করে তার প্রধান অনুষঙ্গই হচ্ছে সেই ভূখণ্ডের মানুষের নিরাপত্তা। তারপর অন্যকিছু। মানুষ নিজেদের সংঘবদ্ধ করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্যই। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে, জানান দেয় এটা আমার দেশ। আর সেই দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় গঠিত হয় নিরাপত্তা বাহিনী। আর সেই বাহিনী পরিচালনার জন্য একটি রাষ্ট্রযন্ত্র। যখন এমন রাষ্ট্রের নাগরিক মারা যায়, তাদের ঘরবাড়িতে আগুন জ্বলে, লুট হয় সম্ভ্রম, সম্পদ; তখন সেই রাষ্ট্র নিজেই প্রশ্নের সমুখে দাঁড়ায়। 

কদিন ধরে যা হচ্ছে, হলো, এটা সেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠার মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা নিয়ে দেখলাম একবার। কিন্তু তখন সব দল, শুভ বুদ্ধির মানুষ এক হয়ে একসাথে মাঠে নেমেছিলো। যার ফলে ভারত থেকে বয়ে আসা উস্কানি, ভারতের উগ্র ধর্মান্ধতা আমাদের দেশে সেভাবে ক্রিয়াশীল হতে পারেনি। তারপরও প্রচুর ক্ষতি হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সেই ক্ষতির ক্ষত সামলে নেয়ার মতন মনোবল ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের। কারণ দুস্কৃতীর চেয়ে ভালো মানুষেরা মাঠে ও পাশে ছিলেন তখন। কিন্তু এবার তা দেখা যায়নি। কেন যায়নি, তার যে ব্যাখ্যা নেই তা বলা যাবে না। বাবরি মসজিদের ঘটনায় সকল রাজনৈতিক দল এক হয়েছিলো রাষ্ট্রের নাগরিকের নিরাপত্তার তাগিদে। সাথে ছিলো ইসলামী সংগঠনগুলোও। কিন্তু এবার তারা আগে থেকেই মাঠ ছাড়া। তাদের মাঠে পাওয়া যাচ্ছে না, বলতে গেলে রাজনীতিই এখন রুদ্ধদ্বার। কেন যাচ্ছে না, কেন রুদ্ধদ্বার, সে প্রশ্নটাও রাজনৈতিক। মূলত এ সকল কিছুই রাজনৈতিক। রাজনীতি আমাদের বড় বেশি পীড়িত করেছে। 

ভারতে নানা সময়ে নানা ঘটনা ঘটেছে। গরুর গোশত রাখার জন্য মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের এর প্রতিক্রিয়া হয়নি। আসামে মুসলমানদের হত্যা করা হলো সেদিন, বাংলাদেশে এর প্রতিক্রিয়া হয়নি। এমন অসংখ্য ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটে ভারতে যার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে তেমন ভাবে কখনো হয়নি। শুধু বাবরি মসজিদের বিষয়টি ছিলো ব্যতিক্রম। কিন্তু এবার কেন ঘটলো। এখনই বা কেন ঘটছে। রামু, নাসিরনগর, শাল্লা, গত এক দশকে বেশ কটি ঘটনা আমাদের বিস্মিত করেছে। এ কোন দেশ! কেন এ দেশের মানুষ এত অনুভূতি প্রবণ হয়ে উঠলো। কথায় কথায় অনুভূতিতে আঘাত বিষয়টি এখন কমন হয়ে দাঁড়িয়েছে। না, শুধু ধর্ম নয় নানা কারণে এখন আমাদের অনুভূতি আহত হয়। অনুভূতি আহত হওয়ার মামলার পরিমান দেখতেই তা বোঝা যাবে। অনুভূতি আহত বিষয়ক এমন মামলার নজির অতীতে কখনো ছিলো না। যারা আগে রাজনীতি করতেন, তারা হাসিমুখে সমালোচনা এমনকি গালিগালাজ শুনে যেতেন। প্রশ্ন করা হলে উত্তরে জানাতেন, ‘রাজনীতি করতে গেলে গায়ের চামড়া মোটা হতে হয়। নেতাদের অনেক কিছুই সইতে হয়।’  কিন্তু এখন রাজনৈতিক নেতা কেন, টুটকা দোকান জাতীয় সংগঠনের নেতাদের গায়ের চামড়া মসলিন কাপড়ের মতন ফিনফিনে হয়ে গেছে। একটুতেই তাদের অনুভূতি আহত হয়। এই আহত অনুভূতির ফল হচ্ছে আজকের ভাঙা প্রতিমা, আগুনে পোড়া বাড়ি আর মানুষের লাশ। 

লেখা যায় অনেক কিছুই, বলাও যায়। কিন্তু বলতে গেলেই ওই অনুভূতির প্রশ্ন, কখন কার অনুভূতি আহত হয়ে যায়। আক্রান্ত হতে হয়। তাই শুধু বলে যাই, আমরা 
একটি রাষ্ট্র গঠন করেছি, যা নিয়ে আমাদের অহঙ্কারের প্রকাশ হয় নানা ভাবে। আজ সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা নেই। সেই নাগরিক হিন্দু না মুসলিম তা রাষ্ট্র গঠনের জন্য জরুরি নয়, রাষ্ট্র গঠনের জন্য জরুরি নাগরিক। সুতরাং নাগরিকের নিরাপত্তার সাথে রাষ্ট্রের সক্ষমতা জড়িত। নাগরিক তখা মানুষ রক্ষা করাই রাষ্ট্র গঠনের মূল চিন্তা। এর বাইরে কিছু নেই। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0783 seconds.