• ২১ অক্টোবর ২০২১ ১৫:৫৯:১৬
  • ২১ অক্টোবর ২০২১ ১৫:৫৯:১৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ‘অসাম্প্রদায়িক সাম্প্রদায়িকতা’

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ‘অসাম্প্রদায়িক সাম্প্রদায়িকতা’ দেখতে দেখতে মাথা নষ্ট হবার জোগাড়। চারিদিকে নানা বিষয় উদ্ধৃত করে মুসলমানদের ভালো হবার উপদেশ দিচ্ছেন সবাই। এই যে মুসলমানদের খারাপ হিসেবে নির্দিষ্ট করে ভালো হবার উপদেশ, এটাই সাম্প্রদায়িকতার মূল শেকড়। 

যারা বলছেন, তারা কি নিশ্চিত যে, মুসলমানগণ খারাপ শ্রেণির মানুষ, তাদের ভালো করতে হবে! গুটিকয়েক অপরাধীর কার্যকলাপের দায় পুরো মুসলিম সমাজের উপর চাপিয়ে দিয়ে তারা দিব্যি অসাম্প্রদায়িকতার মুখোশ পরে আছেন। যে মুখোশের আড়ালে তাদের চাপা শয়তানি হাসি কান পর্যন্ত বিস্তৃত। 

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা হয়েছে। লন্ডনে আক্রান্ত হয়েছেন মুসলিমরা। জার্মানিতে মুসলিম নিগ্রহের ঘটনা অহরহ। হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা কালো খ্রিস্টানদেরই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করে, মুসলমানরা তাদের কাছে মানুষই না। অথচ এসবের দায়ভার তাবত খ্রিস্টান সমাজকে নিতে হয়নি। ভারতে নিয়তই মুসলমান নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে। তার দায়ভার পুরো ভারতের হিন্দু সম্প্রদায় নিচ্ছেন না। মিয়ানমারের ঘটনার দায়ভার নেয়নি বৌদ্ধ সম্প্রদায়। অথচ সব ঘটনার দায়ভার নিতে হচ্ছে পুরো মুসলিম সম্প্রদায়কে। কেন রে ভাই? 

কিছু ‘রামজ্ঞানী’ মানে বড় জ্ঞানী আছেন, যারা কথায় কথায় মুসলমানদের ক্ষমা প্রার্থনার জন্য বলছেন। যে দোষ তারা করেনি, কেন সেজন্য তারা ক্ষমা চাইবে। যদি মুসলিমরা সত্যিকার অর্থেই দোষী হতেন, তাহলে বাংলাদশের মতন দেশে একটা অন্য উপসনালয় ও একজন অন্যধর্মের মানুষ অবশিষ্ট থাকতো না। অথচ গুটিকয়েক অপরাধী, যে অপরাধ মূলত রাজনৈতিক। ভারতাধীন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি প্রধান বলেছেন, বাংলাদেশের ঘটনায় তাদের ভোট তিনগুন বাড়বে। অথচ সব অঘটনের দায় চাপিয়ে দেশের সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে লজ্জিত হবার সাথে ক্ষমা চাইতে বলা হচ্ছে। অর্থাৎ তাদের জোরপূর্বক স্বীকার করানোর চেষ্টা চলছে তারা অপরাধী। এরচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িকতা আর কী হতে পারে! 

এক উঠতি বুদ্ধিজীবী লিখলেন, মুসলমানরা নাকি বলে, ‘হিন্দুর বাড়িতে খাবে না, হিন্দু মরলে যাবে না’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কী পরিমান ঘৃণাবাদী হলে এমন চরম মিথ্যা লিখতে পারেন। অথবা নিজের মানসিক চিন্তা অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন। যারা এমন বলেন তারা কী বর্ণাশ্রমের উৎপত্তি ভুলে গেছেন। যে উঠতি বুদ্ধিজীবী বলেছেন, তিনি বর্ণাশ্রম অনুযায়ী নিচু জাতের। তার ঘরে তো উঁচু জাতের নিজ সম্প্রদায়ের মানুষেরই খাওয়ার কথা নয়। অথচ তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর সুযোগ ছাড়লেন না। এই যে সমগ্র মুসলমানদের ঘৃণ্য বানানোর চেষ্টা, এটা কি সাম্প্রদায়িকতা নয়? 

কোনো কোনো ‘হাফডান’ অ্যাক্টিভিস্ট হাদিস-কোরআনের উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। তারা বোঝাতে চাচ্ছেন কোরআন-হাদিস বিধর্মীদের জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাদের বলি, সারাবছর কোরআন-হাদিস উদ্ধৃত করে সেই কোরআন-হাদিস এবং তার অনুসারীরা যে উগ্রপন্থী তা প্রমানের চেষ্টার পর, এখনকার মলম কি আদৌ কাজে লাগবে? সারাবছর কোরআন-হাদিসের পিণ্ডি চটকাবেন, যখন ঠেকবেন তখন কোরআন হাদিসকে উদ্ধৃত করবেন শান্তির বাণী বলে, এই বৈপরীত্য-দ্বিচারিতা কি ভণ্ডামির অংশ নয়? 

মধ্যযুগীয় বর্বর বলে সারাবছর গালি দিয়ে এখন ইসলাম হয়েছে আপনাদের কাছে শান্তির ধর্ম! মুসলমানদের ধর্মান্ধ, উগ্র আর প্রগতির অন্তরায় আখ্যা দেয়া প্রগতিশীলরা এখন মুসলমানদের মুসলমানিত্ব শেখাচ্ছেন। তারা বোঝাতে চাচ্ছেন মুসলমানদের ধর্ম শান্তির কথা বলে! সত্যিই আজব এসব ‘প্রগতিশীল প্রাণি’ আর বিচিত্র তাদের কায়কারবার। 

দাড়ি, টুপি স্রেফ বসন-ভূষণের ব্যাপার-স্যাপার। রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল মধুসূদন দাড়ি রাখলে দোষ নেই। ফাদার টুপি পরলে টু-টা নেই। ইহুদিদের মাথাতেও টুপি থাকে, তাতে আপত্তি নেই। সেবিকারা মাথায় স্কার্ফ বাঁধলে দোষ নেই, দোষ গিয়ে ঢুকে হিজাবে। এই যে সব আজব সমীকরণ, তা কি বিভেদ-বিভাজন নয়। আর বিভাজন মানেই সাম্প্রদায়িকতা। সুতরাং অন্যকে সাম্প্রদায়িক বলার আগে নিজের চেহারাটা আয়নায় দেখে নিন। সারাবছর লাঞ্ছিত আর অপমানিত মানুষকে একদিনে বুকে টেনে নিয়ে, ‘বলবেন ভাই আমার’, তা কি হয়? হয় না। এতে বরং আপনার ভণ্ডামি, পচে যাওয়া বুদ্ধি, বিক্রিত আত্মার বিকৃত চেহারাটাই ফুটে ওঠে। আর সাথে দৃশ্যমান হয় অসাম্প্রদায়িকতার নামে আপনার প্রকৃত সাম্প্রদায়িক বিভৎস চরিত্রটা। 

শেষ কথা : মুসলমানদের কেন প্রমান করতে হবে, ইসলাম শান্তির ধর্ম। অন্যরা কি কোনো অঘটনের পরে নিজেদের ধর্ম যে ভালো তা প্রমানের চেষ্টা করে? করার প্রয়োজন নেই বলেই করে না। অপরাধীর অপরাধের দায় ধর্ম নেবে কেন? তাহলে তো ধর্ষণের দায়ও যৌনতার নিতে হয়। যৌনতার কারণেই যেহেতু ধর্ষণ। আইনের ভাষায় যৌনতা নির্দোষ, ধর্ষণ অপরাধ। সুতরাং দায় বর্তানোটা হয় চালাকি নয় মূর্খতা। 

সব ধর্মই মূলত শান্তির। অশান্তি ঘটায় অপরাধীরা। যাদের ধর্মান্ধ ট্যাগ করে ধর্মের সাথে জুড়ে দেয়া হয়। যাতে ধর্মকে ভিক্টিমাইজ করা যায়। এটাও রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা। বিভাজন জিইয়ে রাখার করপোরেট পলিসি। 
কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0629 seconds.