• ২৮ অক্টোবর ২০২১ ১৭:১৮:৩৬
  • ২৮ অক্টোবর ২০২১ ১৭:১৮:৩৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ধর্মকে অধর্মের মূল যারা ভাবেন সামাজিক পরিচিতির তত্ত্বটা তাদের অজানা

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

ক্রিকেটে পাকিস্তানের কাছে বাজে ভাবে হেরেছে ভারত। সহ্য হয়নি ভারতীয়দের। হাতের কাছে পাকিস্তানি কেউ ছিলো না, বিকল্প হিসেবে মার খেয়েছে পাঞ্জাবে পড়তে যাওয়া কাশ্মিরি ছাত্ররা। এখানে কিন্তু ধর্ম লাগেনি, মারার জন্য লেগেছে অজুহাত। আর সেই অজুহাত ছিলো খেলা। বলতে পারেন, পাকিস্তানিরা মুসলমান, কাশ্মিরিরাও তাই। সেজন্যই তাদের মার খেতে হয়েছে। অর্থাৎ যোগ-বিয়োগ করে ফল হিসেবে বলা যায়, মুসলমানদের অনেকেই ভারতীয় বলে মানেন না। মুখে স্বীকার করলেও মন তাদের অন্য কথা বলে। 

এটাকে কি সাম্প্রদায়িকতা বলা যায়? না, যায় না। ভারত পাকিস্তানের শত্রুতা এখন দেশজ। যদিও দ্বি-জাতি তত্ত্বের কথা অনেকে তুলবেন। যারা তুলবেন, তাদের জ্ঞাতার্থে বলে নিই, দ্বি-জাতি তত্ত্ব পুরো একটা ভাওতা। নেতাদের ভাগ করে খাবার প্রবণতা ছিলো এই তত্ত্বের মূলে। এ বিষয়ে যাদের পড়াশোনা আছে এবং যারা বোঝেন, তাদের নতুন করে বোঝাতে হবে না। যারা বোঝেননি তারা কখনোই বুঝবেন না। আর তাদের মত মানুষের জন্যই দ্বি-জাতি তত্ত্বের মুলা ঝুলানো। দ্বি-জাতি তত্ত্ব যে ভাওতা কাশ্মির তার প্রমান। 

বাংলাদেশের কথায় আসি। বাংলাদেশ হেরে গেলে কখনো এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় আক্রান্ত হয়নি। ক্রিকেটে অনেকবারই হেরেছে বাংলাদেশ ভারতের কাছে। কিন্তু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ভারতকে পরাজিত করা বাংলাদেশের কাছে অন্যরকম আনন্দের যা প্রতিফলনে পরিষ্কার। তখনও কোনো ঘটনা ঘটেনি, কেউ লাঞ্ছিত হয়নি। দেশ-ধর্ম বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের পার্থক্যটা এইখানেই। ভারততে শত্রু ভাবলে বাংলাদেশেও পাঞ্জাবের মতন ঘটনা ঘটতো। সাম্প্রদায়িকতার ক্ষেত্রেও তাই। সুতরাং বাংলাদেশে এক শ্রেণির কথিত আতেলের দ্বি-জাতি তত্ত্ব বিষয়ক চিৎকার মূলত বুঝে না বুঝে ‘পোঙ্গা-পণ্ডিতে’র কর্ম। 

এরপরেও এই ‘পণ্ডিত’গণ ত্রিপুরার কথা বলবেন। বলবেন, বাংলাদেশের ঘটনার পাল্টা প্রতিক্রিয়াতেই মুসলমানদের উপর আক্রমন। মোটা দাগে অবশ্য তাই মনে হয়। যেমন, দুটো বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো সড়ক দুর্ঘটনা এবং তা মোটা দাগে। কিন্তু এটা শুধু ঘটনা, কার্য-কারণ নয়। এর পেছনে রয়েছে হয় চালকের অসতর্কতা, যান্ত্রিক ত্রুটি, অথবা রাস্তার খানা-খন্দক ইত্যাদিসবের কোন একটা। তেমনি ত্রিপুরা বা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঘটনাও তাই। আর এই ঘটনার কার্য-কারণটাই আসল। ঘটনাটা মোড়ক মাত্র। মোড়ক খাওয়া যায় না, খেতে হয় মোড়ক খুলে ভেতরের জিনিস। মোড়ক বা ছাল খায় বিশেষ একটা চারপেয়ে প্রাণী। 

যাকগে, দীর্ঘদিন ধরেই আমি বলে আসছি সংঘাতের জন্য ধর্ম একটি অনুষঙ্গ মাত্র। সংঘাতের পরিচালক মূলত রাজনীতি এবং প্রযোজক অর্থনীতি। ধর্ম ছাড়াও এর অন্যান্য অনুষঙ্গের মধ্যে রয়েছে বর্ণ, সম্প্রদায় এমনকি খেলাও। যার জন্য আক্রান্ত হয়েছে পাঞ্জাবে কাশ্মিরি ছাত্ররা। ইংল্যান্ডের ফুটবল দাঙ্গা বলা যায় পৃথিবী বিখ্যাত। আমাদের দেশে তো পাড়া-পাড়ায় সংঘাত হয়। দুই পাড়ার মধ্যে লেগে যায়। এই লেগে যাওয়াতে ধর্ম লাগে না। 

এ কথাটাই আমি বলে আসছি। বলে আসছি ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি’ কীভাবে গড়ে ওঠে, কেন গড়ে ওঠে সে ব্যাপারে। ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি’ শুধু একটা কিছুর উপরই নির্ভর করে না। ইদানিং অবশ্য দু’একজন ‘তাজফেল’র ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি থিওরি’ নিয়ে কথা বলছেন। তবে আমাদের বেশিরভাগ ‘পোঙ্গা-পণ্ডিতগণ’ সামাজিক পরিচিতির এই তত্ত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। তাদের অনেকেই ‘হেনরি তাজফেল’ এর নামই শোনেননি। অন্তত কয়েকজন ‘রামবুদ্ধিজীবী’কে জিজ্ঞেস করে তাই মনে হয়েছে। আবার বলি ‘রাম’ মানে বড়। ‘রামবুদ্ধিজীবী’ মানে বড় বুদ্ধিজীবী। আর অনেকেই ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি’র তত্ত্ব খায় না মাথায় দেয় তাও জানেন না। এই না জানাওয়ালাগণ হচ্ছেন সামাজিকমাধ্যমের বুদ্ধিজীবী। তাদের মধ্যে অনেকে আবার ‘তালিকাভুক্ত’। এদের কেউ কেউ আবার ‘রামপদবি’ ধারণ করেন। রামের ব্যাখ্যা তো আগেই দিয়েছি। 

‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি থিওরি’ অনুযায়ী, সংঘাতের কারণ অনেকগুলো। এর মূল বিষয়টি হচ্ছে আমাদের ও তোমাদের ঘিরে। আমরা বা আমাদের এই গোষ্ঠীটি নানা ভাবে গর্বিত হতে পারে। হতে পারে নিজের দেশের পরিচয়ে, সম্প্রদায়গত দিকে, ধর্মীয় এমনকি সাংস্কৃতিক আচরণেও যা হয়ে উঠতে পারে সংঘাতের কারণ। হেনরি তাজফেল থেকে সরাসরি উদ্ধৃত করি। তাজফেল বলেছেন, ‘We divided the world into “them” and “us” based through a process of social categorization.’ আমরা ও তাহারা’ই মূলত সব সংঘাতের মূলে। এই আমরা আর তাহারা নির্ধারণ করে দেয় একটি রাজনৈতিক সমাজ, যে সমাজ নির্মান করে অর্থনীতি। 

সাংস্কৃতিক সংঘাতের কথা বললাম, তাজফেল থেকে সে কথাও তুলে ধরি, `cultures may result in racism; in its extreme forms, racism may result in genocide, such as occurred in Germany with the Jews, in Rwanda between the Hutus and Tutsis and, more recently, in the former Yugoslavia between the Bosnians and Serbs.’ এখন প্রশ্ন হলো সংস্কৃতি বলতে আসলে কী বোঝায়। আমাদের ‘পোঙ্গা-পণ্ডিত’দের মতে, গান-বাজনা, নাটক-থিয়েটার এগুলো? না, সংস্কৃতি মানে মানুষের সামগ্রিক যাপিত জীবন। এরমধ্যে রয়েছে ‘সঙ্গম’ তথা যৌনতাও। সংস্কৃতি মানুষকে ভিন্নতা দেয়। গড়ে তোলে সামাজিক বৈচিত্র্য। অবশ্য এ নিয়ে আলাপ তোলা সময়সাপেক্ষ এবং এ লেখা দীর্ঘ হবে। আর দীর্ঘ লেখা ক্ষেত্র বিশেষে বিরক্তির কারণ ঘটায়। সুতরাং সংস্কৃতির আলাপটা অন্য সময়ের জন্য তোলা থাক। 

মূল কথায় ফিরি। যারা বলেন, ‘ধর্মই অধর্মের মূল’ তারা স্রেফ অন্ধের রাজ্যে বাস করছেন। তারা জানেন না, মানুষের সামাজিক পরিচিতি শুধু ধর্মের উপর নির্ভর করে না। ধর্ম বিষয়টি যদি তুলে দেয়া হয় তবু সংঘাত হবে। আমাদের ও তোমাদের ভিত্তিতে যে সংঘাত। সে সংঘাত হতে পারে বর্ণ নিয়ে, খোদ অ্যামেরিকা যে সংঘাতে ভুগছে এবং ভুগবে। হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা এই সংঘাতেরই চর্চা করছেন। সম্প্রদায় নিয়ে হতে পারে, হুতু-টুটসি’র কথা তো তাজফেল বলেছেন এবং তা অনেকেরই জানা। ভারতে রয়েছে উচ্চবর্ণ আর নিম্ন বর্ণের সংঘাত। ধনী ও গরিবের সংঘাত তো আছেই। খেলা নিয়েও আছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা নিয়ে খোদ আমাদের দেশেই তা ঘটে গেছে। কোথায় বিশ্বকাপ ফুটবল, কোথায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, তা নিয়ে সংঘাত হয় আমাদের দেশে, আজব না। 

সুতরাং এরপরেও যারা ধর্মকে টার্গেট করেন, সেই টার্গেটের মধ্যে রয়েছে মূর্খতা নয় অর্থনীতি ব্যাকড রাজনীতি। এর বাইরে কিছু নেই। মুশকিল হলো মূর্খতা ও উদ্দেশ্যের বিপরীতে এসব লেখা অন্ধের দেশে চশমা বিক্রিরই সমান। অবস্থা দেখে মনে হয়, আমরা মূলত সেই চশমা বিক্রেতাই। 

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0796 seconds.