• ০৩ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২০:৩৯
  • ০৩ নভেম্বর ২০২১ ১৮:২০:৩৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মাদরাসাশিক্ষার্থীর প্রথম হওয়া ও আমাদের বিভাজনের শিক্ষা

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ‘বি’ ইউনিটের ফলাফলে প্রথম হয়েছেন একজন মাদরাসাছাত্র। তেষট্টি হাজারের উপর পরীক্ষার্থী ছিলেন। অথচ মাদরাসা মানেই কারো কাছে ‘গার্বেজ’! এই ‘গার্বেজ’ যখন প্রথম হয়ে যায়, তখন বুঝুন সেই ‘কারো’রা কোন গ্রেডের ‘গার্বেজ’। 

আমাদের সমালোচনা ক্রমেই ‘মন্দালোচনা’ ও ‘ভালোচনা’য় রূপ নিচ্ছে। একদল সবকিছুতেই মন্দ খোঁজে, অন্যরা সবকিছুতে ভালো। এই খোঁজাখুঁজিতে মানুষের ভালো ও মন্দ বেছে নেয়ার বোধ বিভ্রান্ত হয়। আর এই বিভ্রান্তি অনেকটা সেই ঘোলা জলে মাছ শিকারের মতন। 

ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর নমশূদ্রদের পড়াশোনার পক্ষে ছিলেন না। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের কাছে লেখা চিঠি তা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমান করে। অথচ যারা ‘ভালোচনা’ করেন, তারা তাতেও সঙ্গত কারণ খোঁজেন। এটা হলো সেই ‘ভালোচনা’ চর্চার ফল। 

কোনো মানুষই সম্পূর্ণ শুদ্ধ নন। প্রতিটি মানুষেরই কোনো না কোনো অন্ধকার দিক আছে। আলোটা যখন দেখাবেন, সেই অন্ধকারটাও প্রদর্শন করা উচিত। যাতে মানুষ আলো ও অন্ধকারের পার্থক্যটা বুঝতে পারে, বেছে নিতে পারে আলোটা। 

ঈশ্বর বিশ্বাস করেন না, অথচ মানুষকে ঈশ্বর বানাতে চান! দ্বিচারিতা ও বৈপরীত্যের এই অদ্ভুত মূর্খতা যতদিন বন্ধ না হবে, ততদিন এ পৃথিবী ‘আমরা ও তোমরা’ এমন সংঘাতে বিভক্ত থাকবে। অথচ ‘আমরা ও তোমরা’র মধ্যে সংঘাত নয় প্রয়োজন সম্প্রীতির। এই সহজ কথাটা যে কথিত বুদ্ধিজীবী’রা বুঝবে কবে।

উপরের এটুকু লিখেছিলাম আমি গত ২৭ অক্টোবর ফেসবুকে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি লেখা শেয়ার করতে গিয়ে। যে লেখাটি ছিলো ধর্মীয় বিভাজন আর বিভেদের মূল খোঁজার প্রচেষ্টায়। তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতার মধ্যেও যে চরম সাম্প্রদায়িকতা থাকে তা বলার চেষ্টা ছিলো সে লেখায়। লেখাটি দেশ ও বিদেশের দুটো গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে। মূলত মানুষকে চিহ্নিত করে দেয়ার কৌশলের মধ্যে অনেক কিছু নিহিত থাকে। কিছুদিন আগে সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যাওয়া একটা ছবি সম্পর্কে লিখেছিলাম। একজন বন্ধুর জানাযা হচ্ছে, আরেকজন বন্ধু পেছনে বিমর্ষ মুখে বসে আছেন। এখানে বলা হলো, মুসলমান বন্ধুর মৃত্যুতে হিন্দু বন্ধুর বিষাদ। বন্ধুর মৃত্যুতে বন্ধুর বিষাদের আবরণে চিহ্নিত করা হলো ধর্মীয় পরিচিতি। এটাও সাম্প্রদায়িকতা। কেউ বুঝে করেছেন, কেউ না বুঝে। যারা সামাজিক পরিচিতির তত্ত্বটা না জানেন তারা এই ধর্মীয় পরিচিতিটাকেই বিভেদের মূল ভাবেন। কিন্তু বিভেদের মূলটা হলো পৃথিবীকে ‘আমরা-তোমরা’র মধ্যে ভাগ করে দেয়াটা। ধর্ম তার ছোট একটা উপাদান মাত্র। 

আজ যখন লিখছি তখন ঢাকা বিভাগের ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। এখানেও প্রথম হয়েছেন একজন মাদরাসাশিক্ষার্থী। দেশের অন্যতম প্রধান একটি দৈনিক এ নিয়ে শিরোনামের একটা অংশে লিখেছে, ‘মাদ্রাসাশিক্ষার্থী প্রথম’। কেউ এতে আপত্তি জানিয়েছেন। কেউ বলেছেন, এটাও এক ধরণের ধর্ম-বিদ্বেষ। লজিকটা এরকম, শিক্ষার্থী হলো স্রেফ শিক্ষার্থী এখানে মাদরাসা বা স্কুল-কলেজ কী। অনেকে প্রাক-প্রাথমিক ধারণায় বলবেন, হ্যাঁ তাইতো। এটা প্রাক-প্রাথমিক বললাম এ কারণে, ব্যথা পেলে ‘উহ’ শব্দটা যেমন প্রথম বের হয় মুখ থেকে, এটা তেমনই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। এরপর যখন বোধ ফিরে তখন ব্যথার উৎসটা দেখে, সেটা হলো প্রাথমিক ধারণা। অতঃপর ক্রমশ অন্যান্য বিষয়গুলো উঠে আসে। 

হয়তো সেই দৈনিক তাদের নীতিগত কারণে মাদরাসাশিক্ষার্থী উল্লেখ করেছে, সেটা হতে পারে, তাদের মুসলিম বিদ্বেষ- যা প্রকারন্তরে অনেকের কাছেই ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু প্রতিটা অমঙ্গলেই একটা মঙ্গলের দিক আছে। যে ধারাটি বরাবরই মাদরাসা শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষা হিসেবে মানেনি। এই ধারার বুদ্ধিজীবীরা যাদের অনেকে সেক্যুলার বলেন, তারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন এমন শিক্ষাকে। এমনকি সেখানে কী পড়ানো হয় সেটা না জেনেই নানা মন্তব্য করেছেন সেই শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে। তেমন ধারার একটি মাধ্যমের শিরোনাম যখন হয়ে ওঠে, ‘মাদ্রাসাশিক্ষার্থী প্রথম’, তখন সঙ্গতই তাদের কাচের ঘরেই ঢিলটা পড়ে। প্রমান হয়ে যায়, মাদরাসা শিক্ষা একেবারে ফেলে দেয়ার কিছু নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতন ‘প্রগতিশীলতা’র চারণক্ষেত্রেও প্রথম হয়ে জায়গা করে নিতে পারে। যারা বলতে চান বা চাইবেন, এটা ব্যতিক্রম, তাদের বলি, এমন ‘ব্যতিক্রমে’র উদাহরণ নেহাতই কম নয়। উদাহরণ যখন বেশি হয়ে যায়, তখন তা আর ব্যতিক্রম থাকে না, ‘ক্রম’-এ পরিণত হয়। 

বায়তুল মোকাররমে ইসলামি বইমেলা হচ্ছে। বলতে পারেন, ‘ইসলামি বইমেলা’ আলাদা করে কেন? কেন তারা মূল বইমেলায় অংশ না নিয়ে আলাদা নামে বইমেলা করছেন? সঙ্গত প্রশ্ন। আর এমন প্রশ্নের জবাবটা আপনাদের কাছেই। নিজেদের প্রশ্ন করুন, যে প্রকাশকরা বায়তুল মোকাররমের মেলায় অংশ নিচ্ছেন, তাদের কজনকে বাংলা একাডেমি ঠাঁই দিয়েছে? তাদের অবস্থা এরকম, ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট এ তরী। আর না দেয়ার কারণও কেউ খতিয়ে দেখতে যায়নি। উল্টো গা ভাসিয়েছে চর্চিত প্রোপাগান্ডায়। আর সোকল্ড প্রগতিশীলদের গতি ইসলাম শব্দটা শুনলেই থেমে যায়। 

আপনারা মাওলানা রুমি আউরাবেন, ঈমাম গাজ্জালিকে উদাহরণ হিসেবে টানবেন। বলবেন ইবনে সিনা, ইবনে খালদুনের কথা। কিন্তু অস্বীকার করবেন ইসলামকে। অন্য ধর্মের সব দর্শন হবে, এমনকি জায়নবাদী ও তাদেরকে দর্শনকে জায়নবাদ বলে স্বীকৃতি দেবেন, কিন্তু ইসলামকে দর্শন মানতেই যত আপত্তি। এই যে ‘অকাট’ চিন্তা এটাই ইসলামি বইমেলা আলাদা হওয়ার কারণ। ওই কাগজের ‘মাদরাসাশিক্ষার্থী’কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে আলাদা করার ইতিবৃত্তটাও অনেকটা তারই প্রতিফলন বা প্রতিবিম্ব।  
কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

মাদরাসাশিক্ষার্থী

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0791 seconds.