• ২৭ জানুয়ারি ২০২২ ১৪:২৮:৪৮
  • ২৭ জানুয়ারি ২০২২ ১৪:২৮:৪৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভিসি বিরোধী আন্দোলনের পূর্বাপর

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা:

সাস্ট এর ভিসিবিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে আমি কিছু লিখিনি। অনেকের প্রশ্ন ছিলো কেন লিখলাম না, হয়তো ক্ষোভও ছিলো কারো কারো। কিন্তু কেন লিখিনি তা আপনারা নিজেরাই অনুভব করতে পারবেন। যাদের অনুভূতি শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙার রাত থেকেও কাজ করেনি, তারাও পারবেন আরো কদিন গেলে। 
একটা ভিসি’র পদত্যাগ খুব যে একটা কঠিন ব্যাপার, তা কিন্তু নয়। অতীত স্মরণ করলেই তা জানা যাবে, গুগল তো আছেই, সেও হয়তো নিরাশ করবে না। অতীতে ভিসিকে অবরুদ্ধ করা দেখেছি। ফয়েজ আহমেদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের ছোট্ট রুমে আবদ্ধ করে রাখা, সেই রুমে বিদ্যুতের তার কেটে দেয়া, যে রুমে একটা জানালাও ছিলো না, সেটাও দেখেছি। দেখেছি তো, অনেক কিছুই। তবে দেখা হয়নি শুধু চক্ষু মেলিয়া একজন ভিসির পদত্যাগের জন্য এত আয়োজন, এত দক্ষযজ্ঞের। 

এবার সাস্ট এর ক্ষেত্রে কেন এত আয়োজন, মহাযজ্ঞ লাগলো এবং তারপরও ফলাফল অশ্বডিম্ব! জানি না বিজ্ঞজনরা এ ব্যাপারে কী বলবেন। তাদের ব্যাখ্যা কী হবে। তবে আমার সামান্য জ্ঞান বলে, এটা ছিলো একটা ডাইভার্শন মঞ্চ। এ সময় এই দিকে মানুষের দৃষ্টি আবদ্ধ রাখাটা প্রয়োজন ছিলো। কেন ছিলো, সেটা না বোঝার বড় কোনো কারণ নেই। আরেক সাবেক ভিসি নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ দেশের অন্যতম একটি দৈনিকের সাথে সাক্ষাতকারে তার কিছুটা বয়ান করেছেন। বলেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বৃদ্ধির কথা। বলেছেন, সংখ্যা বেড়ে সাত থেকে পাঁচশতাধিক হবার কথা। 

প্রথম থেকেই ভিসিবিরোধী এই আন্দোলনকে রাজনীতির বাইরে রাখার চেষ্টা হয়েছে এবং সেই চেষ্টা ছিলো অবশ্যই সফল। আমাদের দেশের বামদের একাংশের একটা স্ট্র্যাটেজি হলো, সম্ভাব্য ব্যর্থ আন্দোলনকে দল নিরপেক্ষ একটা চেহারা দেয়ার কাজ করা। অথচ আন্দোলন মানেই রাজনীতি। রাজনীতির প্রথম কথা হিসেবে মায়ের দুধের জন্য সন্তানের কান্নার উদাহরণ টানা হয় সেজন্যেই। তাত্ত্বিকরা বলবেন, এ কথাটা মোটাদাগের। এই সকল তাত্ত্বিকেরা হলেন গুণে গুণে বেগুন। বলা যায়, মোহ-মাধুর্যের জাদুস্পর্শে তারা বেগুনের মতই নিরামিষ হয়ে গেছেন। 

জানি অতি প্রগতিশীলরা বলবেন, সরকার নানা ভাবে চেষ্টা করেছে আন্দোলন বানচালের, বন্ধ করার। আন্দোলনের ফান্ড সংগ্রহের, মানে টাকার উৎস বন্ধ করে দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের বাড়িতে বাহিনীর লোক পাঠিয়েছে। যারা টাকা দিচ্ছিল তাদের বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়েছে, মামলা দেয়া হয়েছে। এমনকি খাবারের দোকান বন্ধ করে আন্দোলনকারীদের খাবারের উৎসও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, ইত্যাদি অনেক কিছু। যারা বলেন, তাদের বলি, গত একযুগ ধরে কী দেখছেন, এমন ঘটনা তো নতুন নয়। যদি আন্দোলন করবেন, তাহলে আগেপিছু ভেবে করেননি কেন? জানি, উত্তর হবে এই ছেলেরা তো রাজনীতির মানুষ না, এই আন্দোলন তো রাজনৈতিক আন্দোলন না। বুলশিট। এজন্যই এ আন্দোলন নিয়ে লিখিনি, পরিণতি বুঝেই লিখিনি।

বলবেন, তবে কি ভিসি পদত্যাগ করবেন না? বলছি না যে, করবে না। ভিসি হয়তো থাকবেন না এবং সেটা পদত্যাগ না অন্য কিছু তা সময়েই দৃশ্যমান হবে। তবে এতে একটা মেসেজ খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, এমন আন্দোলনও ব্যর্থ হওয়া সম্ভব। একজন ভিসি সরাতে আমরণ অনশনের প্রায় দেড়শত ঘন্টা পার করেও পার পাওয়া যায়নি। সুতরাং এরচেয়ে বড় কাউকে সরানোটা অসম্ভব। অন্তত অনন্ত জলিলের অসম্ভব কে সম্ভব করার মতন সংলাপ আউরানোরও কেউ নেই। যারা আছেন তারা সবাই শরবতের গ্লাস হাতে দাঁড়ানো। 

অনেকে অধ্যাপক জাফর ইকবালকে নিয়ে কথা বলছেন। কেউ তাকে মহিমান্বিত করছেন, কেউ করছেন উল্টোটা। আসলে তাকে নিয়ে বলার সম্ভবত কিছু নেই। তিনি হলেন অ্যাপরেটাস। অনেকে জানেন তবু অ্যাপারেটাস’র সংজ্ঞাটা দিয়ে দিই, ‘an instrument or appliance designed for a specific operation’, এই হলো অ্যাপারেটাস। জাফর ইকবাল নিজেই বলেছেন, তিনি উপর মহলের সাথে আলোচনা করে এসেছেন। অর্থাৎ তাকে পাঠানো হয়েছে for a specific operation, নির্দিষ্ট কাজের জন্য। সুতরাং অ্যাপারেটাস নিয়ে আলোচনা অর্থহীন। আর যারা ‘আই হেট পলিটিক্স’ ধরণের আলাপ কোনো আন্দোলনের সাথে জুড়ে দেন, তাদের নিয়েও কথা বলা অর্থহীন, তারা অর্থহীন বলে। কেন অর্থহীন, কারণ তাদের ‘আই হেট পলিটিক্স’ ধরণের প্রগতিশীলতা প্রতিপক্ষের কৌশল যেটা অবশ্যই রাজনৈতিক, তার কাছে পর্যুদস্ত হয়েছে। অ্যান্ড দ্যাটস অল। 


চলুন এখন পরবর্তীতে কী হতে পারি তা অনুমান করার চেষ্টা করি। ভিসির ক্ষেত্রে দুটি বিষয় ঘটতে পারে, এক একটু সময় ক্ষেপন করে ভিসিকে সরিয়ে দেয়া হতে পারে। দুষ্টু লোকেরা বলতে পারেন, ‘তা হতে পারে লোভনীয় অংকের উন্নয়ন কাজের বিষয়টি ফায়সালা হবার পর’। আবার এও হতে পারে, আরেকটা ইস্যু এই ভিসি ইস্যুকে ভেনিশ করে দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে যা মূলত হয়ে আসছে। এটা গেলো ভিসির ব্যাপার, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কী হবে। একদিকে তাদের মনোবল ভেঙে পড়বে। এতবড় আন্দোলন ভেস্তে যাওয়া অবশ্যই তাদের মানসিক ভাবে দুর্বল করে দেবে। পাশাপাশি তাদের উপর একধরণের জুলুম শুরু হতে পারে। তাদের চিহ্নিত করা হবে, আঙুল দেখিয়ে বলা হবে, ‘তোরা আন্দোলন করেছিলি না’ এবং শুরু হতে পারে ক্যাম্পাসে তাদের নিগৃহিত জীবন। হয়তো ভিসিপন্থী শিক্ষকদের ক্রূর দৃষ্টির আওতায় থাকবে তারা, সাথে ক্যাম্পাসে ভিসিপন্থী শিক্ষার্থীরা তো আছেই। হতে পারে তাদের শিক্ষা জীবনটাই বিপর্যস্ত হয়ে উঠবে। 

এসব হবে হয়তো সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য। আর ‘আই হেট পলিটিক্স’ আউরানো ছুপা রুস্তমরা ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাবে। সে সুশীলরা চমৎকারসব কাব্যের ভাষায় গদ্য সৃজন করেছেন, তারা যথারীতি অন্য বিষয় খুঁজে নেবেন। বিরোধী রাজনীতিক, যারা তাদের আন্দোলনে সামিল হতে চাইছিলেন, তারাও মুখ ফিরিয়ে নেবেন। সুতরাং যারা সাধারণ শিক্ষার্থী তারা পড়বেন না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থায়। আর তা দেখে অন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক সকল আন্দোলনেই বিমুখ হয়ে পড়বে। ফল যা হবার তাই হবে, সব চলবে বাধাহীন, খুল্লামখুল্লা। 

অবশ্য এসবই হয়তো দিয়ে লিখা, হাইপোথিটিক্যাল। কী ঘটবে তার সম্পর্কে একটা ধারণা হয়তো করা যায়, কিন্তু সময় কখন কী ঘটিয়ে ফেলে তা বলা সত্যিই মুশকিল। গোঁফে তা দেয়া লোকদেরও গোঁফ কামিয়ে পালিয়ে যাবার ইতিহাস রয়েছে। সদ্য সাবেক ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনদের কথাই ধরি না কেন। এদের প্রত্যাবর্তনের কোনো স্পেস নেই যা অনেকের থাকে। সুতরাং যা কিছু করা উচিত তা সীমার মধ্যেই হওয়া উচিত, যাতে প্রত্যাবর্তনের স্পেসটা বন্ধ না হয়ে যায়। 
কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ভিসি বিরোধী পূর্বাপর

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.3794 seconds.