• ২০ মে ২০২২ ২২:৪৮:৩৯
  • ২০ মে ২০২২ ২২:৪৮:৩৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ফাগুন হত্যার তিন বছর : প্রতিশোধ নয়, বিচারের অপেক্ষায় আছি, থাকবো

ছবি : ফাগুন

কাকন রেজা :

প্রায়শই ভুল করে ফাগুনের নম্বরে ফোন দিতে গিয়েও থেমে যাই। রাতে যখন লিখছি, কোনো বিষয়ে হয়তো একটু খটকা লাগছে, অজান্তেই কনটাক্ট লিস্ট থেকে ফাগুনের নম্বর বের করে ফেলি। অভ্যাস, কোনো কিছু জানার জন্য উইকিপিডিয়া ছিলো আমার ফাগুন। ফোন দিতে গিয়ে মনে হয় ও নেই। থেমে যাই, বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। বুঝতে পারি আমার মাথার উপর ছাদটা নেই। আমার রিপ্লেসমেন্ট নেই।

আমার বাবাকে দারুণ ঈর্ষা হয় এখন আমার। মাঝেমধ্যেই নিজের পিতাকে মনে মনে বলি, তুমিতো আমাকে রেখে অন্তত সান্ত্বনা নিয়ে গেছো যে, তোমার কাজের কিছুটা হলেও আমি করতে পারবো। তোমার প্রতিকৃতি হয়ে উঠবো। কিন্তু আমার প্রতিকৃতি কে হবে? পরম্পরাটা যে এখানেই থেমে যাবে।

আমার উপসম্পাদকীয়, প্রবন্ধ-নিবন্ধ যখন প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে, তখনও আমার সম্পাদক ও সাংবাদিক পিতা জীবিত। একটা করে লেখা ছাপা হয়, তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তার সেই আনন্দটা বুঝতে পেরেছিলাম ফাগুন লিখতে শুরু করার পর। আমার পিতা তার আনন্দটা নিয়েই গত হয়েছিলেন, কিন্তু বিগত হননি। কিন্তু আমি বিগত হয়ে যাবো।

যারা ফাগুন, ইহসান ইবনে রেজা, ফাগুন রেজাকে হত্যা করেছিলো, তারা এ চিন্তা থেকেই হয়তো করেছিলো। একটা ধারাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিলো। ফাগুনের এক দাদুকে নিয়ে সবসময় শঙ্কিত ছিলেন দেশের একটা মহল। তার একটা কলাম মানে, একটা সমাধান কিংবা একটা সঙ্গত যুদ্ধের শুরু। তার সন্তানরা কেউ আসেনি তার ধারা ধরে রাখতে। এগিয়ে এসেছিলেন আমার পিতা। অগ্রজের সেই ধারালো লেখার হাত হয়তো তার ছিলো না, কিন্তু একেবারেই পিছিয়ে ছিলেন না ন্যায়ের যুদ্ধে। তারপর আমি হাল ধরে আছি। ফাগুন আমার হাত থেকে সেই হালটা নিতে চেয়েছিলো। কিন্তু ওই যে সেই চক্র, তারা বুঝতে পেরেছিলো আরেকটা মশাল জ্বলে উঠছে ক্রমেই। যে আলো জ্বেলে দেবে, প্রয়োজনে পুড়িয়েও দেবে।

অসম্ভব শূন্য লাগে; মাঝেমধ্যে সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। এই যে তিনটা বছর কেটে গেলো ফাগুন চলে যাবার। যে হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো উদঘাটিত হয়নি। খুনিদের একজন ধরা পড়লেও পেছনে কারা, তা এখনো অন্ধকারে। আমরা হয়তো আন্দাজ করতে পারি, বুঝতেও পারি, কিন্তু প্রমাণ নেই। যারা প্রমাণ খুঁজে বের করবেন তারা অদৃশ্য এক জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় স্থবির হয়ে গেছেন। তাদের দিন হয়ে গেছে একশ চব্বিশ ঘন্টায়। যার ফলেই তাদের কোনো কিছু এগুচ্ছে না।

সত্যিই কখনো-সখনো মনে হয়, প্রীতি বা নাহিদের বাবার মতন বলে ফেলি, ‘আমি বিচার চাই না। কার কাছে বিচার চাইবো।’ পরক্ষণেই মনে হয়, ফাগুনের বিচার হলে কিছু বাচ্চার জীবন হয়তো বাঁচবে। এই খুনিরা যতদিন বাইরে থাকবে ততদিন অনেক বাচ্চার পেছনে ঘুরবে তাদের হন্তারক হাত। বিচার হলে একটা বিষয় কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হবে, গণমাধ্যমের কর্মীদের হত্যার বিচার হয়। তাদের হত্যা করে পার পাওয়া যায় না। যে তরুণরা অনেক আশা নিয়ে গণমাধ্যমে কাজ করতে আসছেন, তারা সামান্য হলেও সাহস পাবেন। এরাও তো আমার ফাগুন, প্রত্যেকেই এক একজন ফাগুন রেজা।

তিন বছর অনেকটা সময়। অনেকে বলেন, সন্তানের শোক ভুলতে নাকি তিন বছর লাগে। যারা বলেন তাদের সম্ভবত কেউই সন্তানহারা হননি। হলে বুঝতেন একজন পিতার যত বয়স বাড়ে, তার দ্বিগুন হারে বাড়ে শোক। তত অসহায় বোধ করেন তিনি। তত মনে হয় তার মাথার উপর ছাদটা নেই, অবলম্বন নেই। এই শোকের কোনো শেষ নেই, সীমাও থাকে না।

ফাগুনের মতন কল্পনাতীত মেধাবী একজন ছেলে শুধু একজন বাবার নয়, দেশের জন্যও অবলম্বন হতে পারতো। গণমাধ্যমের জন্য হতে পারতো দরকারি ‘অ্যাসেট’। যখন গণমাধ্যম ‘লায়াবিলিটিজ’ এর ভারে ভারাক্রান্ত তখন এমন একজন মেধাবীকে হত্যা করা মানে গণমাধ্যমকেই হত্যা করা। এ শুধু আমার পরম্পরাই থামিয়ে দেয়নি, গণমাধ্যমের পরম্পরা অর্থাৎ বিকাশমানতাকেও বাধাগ্রস্ত করেছে।

গণমাধ্যমের বিকাশকে কারা বাধাগ্রস্ত করতে চায় এটা জানতে রকেট বা ড্রোন বিজ্ঞানী হতে হয় না। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহকে কারা হত্যা করেছে? করেছে আগ্রাসী একটি রাষ্ট্র, দখলদার একটি গোষ্ঠীর মানুষেরা। একই ভাবে খাসোগীকে হত্যা করা হয়েছে। ফ্যাসিজমের বলি হয়েছে কালে কালে গণমাধ্যমকর্মীরা। ফাগুনসহ অন্যান্য হত্যাও এর বাইরে কিছু নয়। 

ধর্ম বলে, পিতার চোখের পানি নাকি ঈশ্বরের আসনও টলিয়ে দেয়। জানি না, আমার প্রতিদিনের অশ্রুজল বৃথা যাবে কিনা। যদি যায়, তাহলে হয়তো ঈশ্বরও প্রশ্নের মুখে পড়বেন।

কাকন রেজা : লেখক, সাংবাদিক ও নিহত সাংবাদিক ফাগুন রেজা’র বাবা।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ফাগুন

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.3039 seconds.