• ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৫:১২:৪৩
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৫:১২:৪৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মেয়েদের সাফ জয়, তাকরিমের অর্জন ও মাথামোটাদের চিন্তা

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থানের অধিকারী বাংলাদেশের সালেহ আহমাদ তাকরিম ১১১টি দেশের ১৫৩ জন প্রতিযোগির মধ্যে তৃতীয় হয়েছেন। মুসলিম বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের এমন একটি অর্জন অত্যন্ত সম্মানের, গৌরবের। কিন্তু মুশকিল হলো সাফ ফুটবলে নারীদের বিজয় এবং তাকরিমের এই বিজয় পাশাপাশি হওয়ায়, এ নিয়েও কেউ কেউ ঘোট পাকাতে চেষ্টা করছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে তাকরিম দেশে ফেরেন। রাতের বেলাতেই তাকে বরণ করতে অসংখ্য মানুষ বিমান বন্দরে হাজির ছিলো। আর এটা স্বাভাবিক। সাফ নারী ফুটবলারদের স্বাগত জানাতে যেমন, মানুষ এসেছিলো, তাকরিমকে স্বাগত জানাতেও মানুষ সেভাবেই এসেছিলো। কিন্তু একে ‘উল্টো বুঝলিরে রাম’ অবস্থায় নিয়ে গেছেন অনেকে। ডক্টর পদবীধারী একজনের মন্তব্য দেখলাম সামাজিকমাধ্যমে। তার ধারণা তাকরিমকে স্বাগত জানানোর এই প্রক্রিয়া অনেকটা নারী ফুটবলারদের স্বাগত জানানোর পাল্টা প্রতিক্রিয়া। কতটা সাম্প্রদায়িক হলে এমন ভাবনা একজন মানুষ পুষে রাখতে পারেন।

বরং বলা উচিত ছিলো এতবড় একটা প্রতিযোগিতায় এই সম্মান অর্জনের ব্যাপারটাকে কেন হাইলাইট করা হয়নি। কেন গণমাধ্যমগুলো এ নিয়ে খবর করেনি। কেন সরকারি তরফ থেকে কোনো উদ্যোগ ছিলো না এই বাচ্চাটিকে বরণ করে নেয়ার। না, এসব না বলে বরং বলা হচ্ছে এটা নাকি নারী ফুটবলারদের বিজয় উদযাপনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া। তাদের কে প্রশ্ন করাই যায়, সৌদি আরবের মক্কায় অনুষ্ঠিত ১১১টি দেশের এই প্রতিযোগিতা কি সাফের নারী ফুটবলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া? কী সব মাথামোটাদের সাথে বাস আমাদের। এরাই নামের আগে ডক্টর পদবী লাগিয়ে ঘুরে বেড়ান। অসাম্প্রদায়িকতার নাম করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ান। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ও মুসলিম। ওর কোনো অর্জন উদযাপন করা যাবে না। ওর কোনো অর্জন সম্মানের হতে পারে না।

তাকরিমের এই অর্জনকে কেন অগোচরে রাখার চেষ্টা হলো এই কথা বলতে গেলে, দোষ কিন্তু এ দেশের মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও অ্যাকটিভিস্টদের উপরও অনেকটা বর্তায়। নারী ফুটবলারদের কেউ কেউ যদি সামাজিকমাধ্যমে মর্মস্পর্শী সেসব কথা না লিখতেন তাহলে হয়তো এই ছাদখোলা বাস, এই সংবর্ধনার আয়োজন তার অনেকটাই কাটছাট হতো। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সম্ভবত তড়িঘড়ি করে সব শেষ করে সবাই বাড়ির পথ ধরতেন। কারণ এই জয়ে বাফুফের মিনিমাম কৃতিত্ব নেই। পুরো কৃতিত্ব মেয়েদের এবং দলটির কোচের। বলবেন, নেই কেন? এর উত্তর হচ্ছে, যেহেতু সাফ গেমসে নারী ফুটবলের একটি ইভেন্ট রয়েছে সুতরাং নিয়মমাফিক একটি দল পাঠাতে হতোই। এটা জাস্ট রুটিন ওয়ার্ক। হার কিংবা জিত এখানে বড় কথা নয়। পুরুষ ফুটবল টিমেরই যে অবস্থা সেখানে নারীদের থেকে কোনো আশা বাফুফের হয়তো ছিলো না। কিন্তু নারীরা ধামাকা ঘটিয়ে ফেললো। তারপর কাপজয়ী মেয়েদের গর্বিত উচ্চারণের সাথে সুর মেলালো দেশবাসী, পাল্টে গেলো সব। বাধ্য হলো ছাদখোলা বাস দিতে, সংবর্ধনার বর্ণাঢ্য আয়োজন করতে। প্রান্তিক গ্রাম থেকে উঠে আসা মেয়েদের কথা জানান দিলো গণমাধ্যম। সামাজিকমাধ্যম ফুঁসে উঠলো মেয়েদের বেতন বৈষম্য নিয়ে। ফলেই তাদের বাড়িঘর করে দেয়ার কথা উঠে আসছে এখন। কিন্তু মনে কী ছিলো তা বোঝা গেলো মেয়েদের লাগেজ থেকে টাকা চুরি হওয়ার পর। বোঝা গেলো কাপজয়ী এক মেয়ের পরিবারকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের অপচেষ্টার পর।

এই যে গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ, সামাজিকমাধ্যমে গণমতের সৃষ্টি করা, তাকরিমের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও অ্যাক্টিভিস্টরা। তারা সেভাবে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেননি কিংবা করার চেষ্টা করেননি। অহেতুক না-না কারণে তারা যেভাবে ফেসবুকে ঝাঁপিয়ে পড়েন তার কোন নজির এক্ষেত্রে দেখাতে পারেননি তারা। ফলে তাকরিমের অর্জনের প্র্রচারটা সেভাবে আসেনি দেশবাসীর সমুখে। যে কারণেই অসাম্প্রদায়িক খোলসে চরম সাম্প্রদায়িকরা এ নিয়ে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন। কারণ তাদের চেষ্টাই থাকে দু’পক্ষকে লড়িয়ে দিয়ে তার থেকে ফায়দা আদায় করতে। তসলিমার কথাই ধরুন না। তিনি কদিন আগে নতুন গাড়ি কিনেছেন, তার প্রচার দিয়েছেন ফলাও করে। একজন নির্বাসিত মানুষ, যিনি নিজের দেশ, নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, সেই মানুষটি যখন নতুন গাড়ি কিনেন। নিজের ‘পশ’ জীবন-যাপন চিত্রের প্রদর্শন নিজেই করেন, তখন তার দুঃখে দুঃখী হতে গেলে নিজের ভেতর একধরণের দ্বিধা সৃষ্টি হয়। তসলিমার এই জীবন-যাপন, এই যে নাম-কাম সবই দুই পক্ষকে লড়িয়ে দেয়ার লভ্যাংশ থেকে প্রাপ্ত।

সুতরাং অন্যকে দোষ দেয়ার আগে নিজেদের দোষ দেখতে হবে। মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও অ্যাক্টিভিস্টরা এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রকম ব্যর্থ, এটা স্বীকার করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সামাজিকমাধ্যমে অকাজের কাজ না করে নিজেদের অর্জন, নিজেদের ইতিহাস তুলে ধরাই বড় কাজ হওয়া উচিত তাদের। কিন্তু তারা করছে উল্টোটা। একজন সামান্য কিছুতে উস্কে দিলো, সেই উস্কানিকে ধরে তারা ঝাঁপিয়ে পড়লো ইসলাম রক্ষার স্লোগান তুলে। আরে, ইসলাম আপনার রক্ষা করতে হবে না, ইসলাম রক্ষার প্রতিশ্রুতি স্বয়ং খোদাতায়ালা দিয়েছেন, আপনি কোন ছাড়। আপনার কাজ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক। ইসলামের সত্যিকার দিকগুলো তুলে ধরা। ইসলাম যে সাম্যের কথা বলে, মানুষের কথা বলে তা জানানো। কোরআনে যুদ্ধকালীন সময়ে নাযেল হওয়া সুরা ছাড়া বেশিরভাগ জায়গায় আল্লাহাতায়ালা ‘মানবজাতি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সেই আল্লাহর দেখানো পথে, ধর্মীয় গণ্ডিতে আটকে না রেখে, মানবজাতির কল্যাণে ইসলামের দর্শনকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করাই মুসলিম বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ ও অ্যাক্টিভিস্টদের কাজ হওয়া উচিত। 

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক।

 

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.3662 seconds.