• ৩০ অক্টোবর ২০২২ ১২:৫৫:৫৪
  • ৩০ অক্টোবর ২০২২ ১২:৫৫:৫৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সংস্কৃতি বনাম চাপিয়ে দেয়া সর্বজনীনতা

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

দেশের ‘প্রথম বর্গ’ এর এক পণ্ডিতকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘বাঙ্গালী’ শব্দটার উৎপত্তি নিয়ে। জানতাম বলতে পারবেন না। সাত এবং পাঁচে চৌদ্দ বুঝিয়ে পার পেতে চাইলেন। কিন্তু ছাড়ছি না দেখে বলে বসলেন, ‘আপনি সেক্যুলার নন’। বললাম, এই প্রশ্নের সাথে সেক্যুলারিজমের কী সম্পর্ক? তার উত্তর, ‘এই প্রশ্ন যারা করে, তারা সেক্যুলারিজমে বিশ্বাস করে না।’ বুঝলেন তো, ‘বিশেষ-অজ্ঞ’দের চেতনাবাজি আর কী। 

হালে সেই পণ্ডিতদের ‘দ্বিতীয় বর্গ’ এর একজনকে নিয়ে আলাপ হচ্ছে। যিনি ভাইফোঁটা নিতে গিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি’র মালা জপেছেন। তাকে যদি ‘বাঙ্গালী’ শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে বলতে বলা হয়, নিশ্চিত বলতে পারি গুগল ঘাটা ছাড়া সাত-পাঁচ চৌদ্দও বলতে পারবেন না। ‘বাঙ্গালী’ যা পরবর্তীতে ‘বাঙ্গালি’ এখন ‘বাঙালি’ বানানেও লিখা হয়। সে সম্পর্কে গুগল ঘাটলে যা পাওয়া যাবে তার মর্মকথা হলো, ‘বাঙ্গালী’ শব্দের উৎপত্তির নির্ভুল ইতিহাস নেই বা অজ্ঞাত। যেখানেই যান দেখবেন বলা হয়েছে, বঙ্গের সাথে আল যুক্ত হয়ে বাঙ্গাল শব্দটির উৎপত্তি। বাঙ্গাল থেকে থেকে ‘বাঙ্গালী’ হবার কোনো সুনির্দিষ্ট বর্ণনা নেই, তথ্য প্রমাণ নেই।

দেশ ও বিদেশের যারা ইতিহাস লিখেছেন সেই প্রাচীনকাল থেকে তাদের কারো বর্ণনাতেই বাঙ্গাল মুলুক এবং বাঙ্গাল শব্দটা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। এই ‘বাঙ্গালী’ শব্দটা জোরেসোরে উচ্চারিত হতে শুরু করে ১৯০৩ সাল থেকে। যখন বঙ্গভঙ্গের কথা বলতে শুরু করেছে ইংরেজ সরকার। ১৯০৫ সালে যখন বঙ্গভঙ্গ হয় এবং পশ্চিমবঙ্গের ব্রাহ্মণ্যবাদী ঘটিরা যখন বুঝতে শুরু করে বঙ্গভঙ্গ টিকে থাকলে তাদের হাতে হারিকেন উঠবে। তখনই তারা পূর্ববাংলার অবহেলিত, অচ্ছ্যুৎ বাঙ্গালদের সামনে ‘বাঙ্গালী’ নামক মুলা ঝুলায়। স্লোগান উঠে, ‘তুমি কে আমি কে, বাঙ্গালী বাঙ্গালী।’ অর্থাৎ কৌশলী ব্রাহ্মণ্যবাদ এই স্লোগানে প্রলেতারিয়েত তথা মজলুম বাঙ্গালদের বোঝাতে চেষ্টা করে, বাংলা ভাষায় কথা বলা অর্থাৎ বাঙ্গাল ও ঘটি মিলেই এক জাতি এবং তা ‘বাঙ্গালী’। সে অর্থে ‘বাঙ্গালী’ শব্দটি রাজনৈতিক। কথা পরিষ্কার, এর বাইরে ইতিহাসের কোনো শক্ত বয়ান নেই। যা আছে তা সব সাত-পাঁচ চৌদ্দ।

দ্রাবিড়দের একটা অংশকে বলা হতো ‘বং’। অনেকের মতে এই ‘বং’ নামীয় দ্রাবিড়দের হতেই বঙ্গ শব্দটির উৎপত্তি। সেই বঙ্গ থেকেই ভূখণ্ডের নাম বঙ্গ। যা থেকে বাঙ্গাল মুলুক। মোগল আমলে বঙ্গের নাম হয় ‘সুবা বাঙ্গালা’। সেই ‘বাঙ্গালা’র অধিবাসীদের তখনও ডাকা হতো বাঙ্গাল। তবে অনেকের মতে ‘বঙ্গ’ ও ‘বঙ্গাল’ আলাদা ভূখণ্ড তথা দেশ ছিলো। সেই ‘বঙ্গাল’ থেকে বাঙলা নামটি আসে। অর্থাৎ প্রাচীন যত মতের কথাই বলা হোক, সবখানেই ‘বঙ্গ’ আর ‘বাঙ্গাল’ শব্দটির আধিক্য, যেখানে ‘বাঙ্গালী’ শব্দটি খুঁজে পাওয়া দুস্কর। ১৯০৩ সালের পর ‘বাঙ্গালী’ শব্দটির প্রবল প্রচলন শুরু হয়। নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে থাকার স্বার্থে ঘটিরাও সায় দেয় তাতে। অথচ এই ঘটিরাই ‘বাঙ্গাল’দের বাংলাকে ‘বাঙ্গাল ভাষা’ বলে আখ্যা দিতো। ‘ধুতি’ বাঁচানোর তাগিদেই তারা ‘বাঙ্গাল ভাষা’কে বাংলা বলতে রাজি হয়। প্রকৃত অর্থে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন থেকে ‘বাঙ্গালী’ শব্দটি শক্ত ভিত্তি পায়। যা কালক্রমে ‘বাঙ্গালি’, হাল আমলে ‘বাঙালি’তে ঠেকেছে।

এখন আসি ‘বাঙ্গালী’ সংস্কৃতির কথিত আলাপে। তার আগে সংস্কৃতির উৎপত্তি বিষয়ে অতি সংক্ষেপে কথা সেরে নিই। সংস্কার থেকে সংস্কৃতি। সুতরাং আদি সংস্কৃতি বলে কোনো কিছু ধরে রাখা বরং সংস্কৃতিজ্ঞানের খেলাপ। আর সংস্কৃতি কখনো সর্বজনীন হয় না। হওয়া সম্ভবও নয়। বাঙ্গাল মুলুকের আদি সংস্কৃতি কী, এ কথা বলতে গেলে দ্রাবিড়দের সংস্কৃতির কথা জানতে হবে। বর্ণাশ্রম বিরোধী দ্রাবিড়দের সংগ্রামী ইতিহাসের কথা জানতে হবে। আর্যদের আধিপত্যবাদের কথা জানতে হবে। যে ভাইফোঁটা নিয়ে কথা হচ্ছে তাকি বাঙ্গাল মুলুকের প্রকৃত সংস্কৃতি কিনা তা জানতে হবে। না জেনে লম্ফঝম্ফ এবং ভাইফোঁটাকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতিসত্তার সংস্কৃতি বলে চাপিয়ে দেয়াটা হবে খোদ সংস্কৃতির বিরোধীতা।

এর আগে লিখেছিলাম ‘পানি’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে। আমাদের দেশের অনেক আঁতেলরাই ‘জল’কে বাংলা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং পানিকে বাতিল করতে চেয়েছেন অন্য ভাষা থেকে ধার করা বলে। এদের আঁতেল বললাম এই কারণে যে, তারা একই সাথে ‘চর্যাপদ’কে বাঙলার আদি সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেন বিপরীতে সেই আদি সাহিত্যের ‘পানি’ শব্দকে অস্বীকার করে ‘জল’কে প্রতিস্থাপন করতে চান। এই যে দ্বিচারিতা, এটা কারো অজ্ঞতার ফল, আর কারো পুরানো জমিদারিত্ব ফিরে পাওয়ার গোপন ইচ্ছের প্রতিফলন। এর আগেও দিয়েছি চর্যাপদ থেকে উদাহরণ, এখন বাধ্য হয়েই আবার দিতে হচ্ছে।

‘তিণ ন চছুপহী হরিণা পিবইই না পাণী। হরিণা হরিণির নিলঅ না জাণী।’

অর্থাৎ বন্দি হরিণ আতঙ্কে পানিও পান করে না। চর্যাপদে কিন্তু ‘পাণী’ তথা পানি শব্দটিই ব্যবহার হয়েছে। রাধার আকুলতার বর্ণনাতেও এসেছে পানি শব্দটি।

‘আঝর ঝরএ মোর নয়নের পাণী। বাঁশীর শবদেঁ বড়ায়ি হারায়িলোঁ পরাণী।’

অর্থাৎ আদি সাহিত্যের বর্ণনায় রাধার চোখ থেকেও পানি ঝরেছিলো, জল নয়। আঁতেল তথা রাজনৈতিক সংস্কৃতিবানদের জানিয়ে রাখি, পানি হলো প্রাকৃত অর্থাৎ মূল শব্দ। জল হলো সংস্কার করা ‘সংস্কৃত’। যে সংস্কৃত মূলত ধর্মীয় গ্রন্থ লেখার জন্য সংস্কারের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিলো। অনেকে এই সংস্কৃত’কেই আবার বাংলার জননী বলে আখ্যায়িত করেন। এদেরকে কি বলবেন, বুদ্ধিহীন বুদ্ধিজীবী? নাকি সুবিধাবাদী রাজনৈতিক?

ভাইফোঁটা একটি ধর্মীয় সংস্কৃতি। বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ হতে পারে তা, এর বাইরে কিছু নয়। এরমধ্যে সর্বজনীন বলে কিছু নেই। যেমন, মিলাদ একটি ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং তা কোনভাবেই সর্বজনীন নয়। অনেক আঁতেল আবার প্রশ্ন করতে পারেন, ধর্ম আবার সংস্কৃতি হলো কীভাবে? তাদের বলি মানুষের জীবনযাপনের পুরোটাই সংস্কৃতি। কিন্তু সব সংস্কৃতিই সর্বজনীন নয়। ধর্ম, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী ভেদে সংস্কৃতির আলাদা রূপ রয়েছে। এই আলাদা রূপই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। যা মানুষকে আলাদা ভাবে চিনতে সহায়তা করে। তাদের নিজস্বতাকে অন্যের কাছে দৃশ্যমান করে। যারা এই বৈচিত্র্যকে স্যালাইন তরিকায় ঘুটা মেরে এক করে দিতে চান, তারা মূলত সংস্কৃতিকেই ধ্বংস করার মিশনে রয়েছেন। ভাইফোঁটার বৈচিত্র্যকে সর্বজনীন করার প্রচেষ্টাও তাই।

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

সংস্কৃতি

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1640 seconds.