• ১৭ নভেম্বর ২০২২ ১০:৫২:৩৯
  • ১৭ নভেম্বর ২০২২ ১০:৫২:৩৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বেনারস ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী, আমাদের কলাবিজ্ঞানীগণ ও সৃজনশীল প্রশ্ন

ছবি : কাকন রেজা

কাকন রেজা :

ভারতের বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এর হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও ক্যাটারিং টেকনোলজির ছাত্রদের পরীক্ষায় দুটো প্রশ্ন ছিলো গরুর মাংস নিয়ে। এতেই ক্ষেপে উঠেছেন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ। এতে নাকি তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। যারা প্রশ্ন করেছেন তাদেরসহ উপাচার্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়টি নিয়ে খবর করেছে বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। 

বিশ্বে গরুর মাংস রপ্তানিতে ভারতের জায়গা এক থেকে তিনের মধ্যে। অন্যতম গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশের হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও ক্যাটারিং বিষয়ের প্রশ্নে গরুর মাংস আসবে এটাই তো স্বাভাবিক। সারাবিশ্বের হোটলগুলোতে গরুর মাংস পরিবেশনের বিষয়টি সবার জানা। খাদ্য হিসেবে গরুর মাংস বিশ্বের অধিকাংশ লোকের পছন্দ। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের যদি ভারতের রাস্তার পার্শ্বের ধাবাগুলিতে চাকরি করতে হতো, তাহলে হয়তো গরুর মাংসের ব্যাপারটা জানতে হতো না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও ক্যাটারিং পড়তে হলে এবং বিশ্বমানের হোটেলে ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে গেলে তো গরুর মাংসের ব্যাপারটা জানতেই হবে এবং এর কোনো বিকল্প নেই।

মুশকিল হলো আমাদের দেশেও গরুর মাংস নিয়ে প্রায় একই ধরণের আলাপ চলে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে গরুর মাংস পরিবেশন নিয়েও কথা হয়েছে, খবর হয়েছে। তবে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এদেশের পার্থক্য হলো ওখানে গরুর মাংস নিয়ে আপত্তি তোলেন হিন্দুত্ববাদীরা আর এখানে কতিপয় কথিত সেক্যুলাররা। এই সেক্যুলার এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দুত্ববাদীদের পরিচয় আলাদা হলেও লক্ষ্য কিন্তু একটাই। তারা যে কোনো উছিলায় সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়ার তালে থাকেন। পাগলাকে সাঁকো না ডোবানোর কথা বলে ডোবানোর বিষয়টাকে মনে করিয়ে দেন।

ইদানিং অসাম্প্রদায়িক বলে কথিত আমাদের দেশের মাথামুণ্ডুদের ভেতরের কথা এখন ফাঁস হচ্ছে নিজেদের চুলোচুলিতেই। চেতনাবাজির বাজিকরদের আসল চেহারা ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে। তাও ‘ঘরের কথা পরে জানলো ক্যামনে’ স্টাইলে। সম্প্রতি দলীয় কবি হিসেবে পরিচিত নির্মলেন্দু গুণের আলাপে আরেকজন প্রয়াত লেখক-কবি সৈয়দ শামসুল হকের ভেতরের অনেক কথা ফাঁস হয়ে গেছে। এ নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে আলাপ অনেকদূর গড়িয়েছে। বেড়িয়ে এসেছে অনেক ভেতরের কথা। অনেকেই যা নিগ্রহের ভয়ে বলতে পারতেন না এতদিন। যা এখন নিজেদের চুলোচুলিতেই সমুখে আসছে।

প্রশ্ন করতে পারেন নির্মলেন্দু গুণ এমন কেন করলেন? এর উত্তরটা খুব কঠিন নয়। সৈয়দ শামসুল হক এখন মৃত। মৃতের পক্ষে বাজিকরি করা সম্ভব নয়। এখন সে মূল্যহীন। এখন আর কোনো বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা সম্ভব হবে না তার। কিংবা মাইক্রোফোন হাতে বক্তৃতাও। নচিকেতার একটা গান আছে না, ‘মরা মানুষের চুল ছিড়লে তার ওজন কমে কি’, কমেও না বাড়েও না। অর্থাৎ মৃত মানুষের আর কোনো কাজ নেই। সুতরাং তাকে অযথা বিভিন্ন জায়গায় অন্যদের আগে স্মরণের কী দরকার। বিভিন্ন তালিকায় তাদের নাম রাখারই কী দরকার। সৈয়দ হকের কাজ তো শেষ। এরা সরে গেলে নির্মলেন্দু গুণরা জায়গা করে নেবেন। তাদের ক্রমিক এগিয়ে আসবে। এটাই সুবিধাবাদের বাস্তবতা। অপেক্ষা করুন, সময় আসছে আরো অনেক কিছু বেড়িয়ে আসবে। প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেছে। মানুষ কথা বলতে শুরু করেছে।

নির্মলেন্দু গুণ অথবা সৈয়দ হক এদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কি বলতে পারেন? তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো তারা নিজ কাজের উপর ভরসা করতে পারেননি। নিজ কাজ দিয়ে টিকে থাকবেন এমন কোনো বিশ্বাস তাদের মধ্যে ছিলো না। তাই তারা সাহিত্য পেছনে ফেলে ব্যক্তিকে প্রাধ্যন্য দিতে উদগ্রীব ছিলেন। তাদের সংগঠন করতে হয়েছে। রাজনীতি করতে হয়েছে। ভান করতে হয়েছে, নির্জলা মিথ্যা বলতে হয়েছে। বিবৃতিবাজি করতে হয়েছে। এমনকি করতে হয়েছে নির্বাচনও। না, লেখক-কবিদের পক্ষে ভান ও মিথ্যা বলা বাদে অন্যসব করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এই লেখক-কবিরা লেখক সত্তার বিনাশ ঘটিয়ে বিকাশ ঘটাতে চেয়েছেন সুবিধাবাদী রাজনৈতিক সত্তার। ঝামেলাটা এখানেই। তারা লেখক-কবির চেয়ে রাজনীতিবীদ বেশি হয়ে উঠতে চেয়েছেন। যার ফলে রাষ্ট্রচিন্তার সাথে তাদের অবস্থানটা ক্রমেই সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে। নিজ ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে দ্বান্দ্বিক হয়ে উঠেছে। তারা ক্রমেই দেশের সাংস্কৃতিক চিন্তাকে নজরআন্দাজ করে আরোপিত চিন্তার প্রচারণায় তৎপর হয়ে উঠেছেন। ফলে দেশের সিংহভাগ মানুষ তাদের দেখেছে সুবিধাবাদী হিসেবে। আর বিভ্রান্ত এসব লেখক-কবিরা মানুষের চিন্তাটাকে বুঝে উঠতে পারেননি। কিংবা বুঝে উঠলেও তাদের উচ্চাকাংখা ও লোভের কাছে হার মেনেছে মানুষের ভাবনা। মোটকথা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গড়তে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। মানুষের চিন্তার মর্যাদা দেয়া তাদের ভেদবুদ্ধির ফলে সম্ভব হয়নি।

ভারতের বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির যেসব শিক্ষার্থী গোমাংস বিষয়ে যে দাবি করছেন, তাদের উচিত হবে হিন্দু ইউনিভার্সিটিকে ধর্মীয় বিদ্যালয় বানানো। অথবা যেসব বিষয ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক সেসব বিষয় পড়ানো বাদ দেয়া। সবার আগে বিজ্ঞানের সকল বিষয় অপসারণ করা। কারণ বিজ্ঞান ও মিথোলজি সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তবে আমাদের দেশের ‘কলাবিজ্ঞানী’দের কথা অবশ্য আলাদা। তারা মিথকেই উল্টো বিজ্ঞান ভাবেন। বিজ্ঞানের আলাদা ফর্ম নিয়ে কাজ করতে চাইলে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এসব কলাবিজ্ঞানীদের দ্বারস্থ হতে পারে। যে কলাবিজ্ঞানীদের ধারণায় থাকে ফানুস উড়ানোর পেছনে যে ধর্মীয় দর্শন কাজ করে তা বিজ্ঞানমনস্কতা, ফানুস উড়ানোটাও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কাজ। এমন অসংখ্য নজির দেয়া যাবে, যা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই গোমাংস বিরোধী শিক্ষার্থীদের চিন্তার সাথে মিলে যাবে। তাই হয়তো তারা বলেন, দেশভাগ তাদের শরীরকে আলাদা করেছে আত্মাকে পৃথক করতে পারেনি। তারা কাঁটাতার মুছে দিতে চান। দেশভাগ তাদের যাতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

দুই.

লেখাটার উপরের অংশ কিছুদিন আগের। লিখে রেখেছিলাম কিন্তু কোনো গণমাধ্যমে দেয়া হয়নি। আজকে আমাদের দেশের সৃজনশীল প্রশ্নের ব্যাপারে কথা উঠেছে। ‘নেপাল-গোপাল’ প্রশ্নে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কথা উঠেছে, কথা উঠেছে একজন সাহিত্যিককে অসম্মান করার প্রশ্নে। প্রথমে সৃজনশীল ব্যাপারটা নিয়ে বলি। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়ার বিষয়ে প্রবাদ-প্রবচন শুনেছেন, সৃজনশীল হলো তাই। যারা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পড়াবেন, প্রশ্ন করবেন, তাদের অনেকেই সৃজনশীল ব্যাপারটা সঠিক ভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। উল্টো পুরো বিষয়টাকেই গুবলেট করে ফেলেছেন। তাই তারা শিক্ষার্থীদের পড়াতে যেমন ব্যর্থ হচ্ছেন, তেমনি প্রশ্নপত্র তৈরিতে সফলতার স্বাক্ষর রাখতে পারছেন না। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দিলে যেমন ঘোড়াও আগায় না, গাড়িও চলে না, অবস্থাটা সে রকম আর কী।

আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাই মূলত ব্যর্থ হতে চলেছে। এই যে, ‘জিপিএ ফাইভ’ মার্কা শিক্ষা ব্যবস্থা এ স্রেফ মাকাল ফল উৎপাদন করছে। আমরা প্রায়শই লজ্জিত হচ্ছি, বিব্রত হচ্ছি। অদ্ভুত টাইপ প্রশ্নপত্র হচ্ছে। যে পত্রের প্রশ্ন দেখলেই বোঝা যায় এটা ‘গার্বেজ প্রডাকশন’ এর ‘প্রডাক্ট’। শুদ্ধ বিজ্ঞান যখন কলাবিজ্ঞানে রূপ নেয়, তখনকার ‘প্রডাকশন’ আর এই ‘গার্বেজ প্রডাকশন’ মূলত একই জিনিস। ভারতে সঠিক প্রশ্ন করে বিপাকে পড়তে হয়েছে, আর আমাদের প্রশ্নই ছিলো বেঠিক।

দু’দেশেই কমন বিষয়টা হলো প্রশ্ন। ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতায় থাকায় বিপত্তি বেঁধেছে। আর আমাদের এখানে প্রশ্নকর্তারা সেক্যুলার পোশাকে এসে সাম্প্রদায়িকতা কায়েম করতে চাইছেন। ছড়াতে চাচ্ছেন ঘৃণা। ঘৃণা ছড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে আনিসুল হকের নাম। বিষবৃক্ষ রোপণ করলে তার ফল খেতেই হয়। এই যে ঘৃণাবাদী বিষবৃক্ষ, এটা রোপিত হয়েছে এখন যারা ঘৃণাবাদিতার শিকার হচ্ছেন, তাদের নীরবতায়। নীরবতা সম্মতির লক্ষণ। সেই সম্মতিতে বিষবৃক্ষ এখন ফলে-ফুলে সম্পূর্ণ। যারা রোপণ করেছেন এই বৃক্ষের ফল শুধু তাদের খেতে হলে একটা কথা ছিলো। কিন্তু এই বিষফল এখন গড় সবাইকে খেতে হচ্ছে, বিপত্তিটা সেইখানেই।

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বেনারস ইউনিভার্সিটি

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1542 seconds.