• ২৭ নভেম্বর ২০২২ ০১:০৬:১৯
  • ২৭ নভেম্বর ২০২২ ০১:০৬:১৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ব্রাজিলের জয়, দো’দিল বান্দা এবং ভুল বিপ্লব

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো কথা বলিনি এ পর্যন্ত। না, আমিও ফুটবল পছন্দ করি এবং ভীষণভাবে। আমারও পছন্দের দল রয়েছে। কিন্তু তার জানান দিইনি সামাজিকমাধমে। আমার মনে হয়নি এই উচ্ছাস কিংবা বেদনা প্রকাশটা হাল সময়ের প্রায়োরিটির তালিকায় পড়ে। কেন হয়নি, সে বিষয়ে পুরোটা লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। সেটা বাদ দিয়ে ব্রাজিলের জেতা এবং আমাদের দেশের গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রকাশিত সে জয়ের খবর নিয়ে কথা বলি। কথা বলি, আমাদের মনোবৈকল্যের দিকগুলোর প্রাথমিক বিষয় নিয়ে।

আমি ব্রাজিলের জেতার পরেই অন্তত দেশের প্রধানতম পাঁচটি গণমাধ্যমের খবর পড়লাম। খবরগুলি পড়তে গিয়ে সঙ্গত দেখা মিললো এই মনোবৈকল্যের। খবর লিখতে গেলে একবারে মাঝ বরাবর থেকে লিখতে হয়। কলাম, প্রবন্ধ বা নিবন্ধে আপনি আপনার পক্ষ ও পছন্দের কথা বলতে পারেন। কিন্তু খবর বিষয়টা পুরোটাই নিরপেক্ষ। এক গণমাধ্যমে দেখলাম লিখেছে, প্রথমার্ধে সমর্থকদের হতাশ করলেন তিতের শিষ্যরা। সেই খবরে ব্রাজিলের সফলতার চেয়ে ব্রাজিলকে সার্বিয়ার রক্ষণভাগ ভেদ করতে কতটা কষ্ট করতে হয়ছে সেই বর্ণনাই বেশি রয়েছে। যিনি লিখেছেন তিনি নির্ঘাত আর্জন্টিনার সমর্থক। তাই ব্রাজিলের সফলতার চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি চোখে পড়েছে তার। বিপরীতে ব্রাজিলের সদ্য খেলার বিবরণের সাথে ব্রাজিলের কতটা গুণগান গাওয়া যায় সেই প্রচেষ্টাও চোখে পড়েছে ব্রাজিল সমর্থক রিপোর্টারের বিবরণে।  

আমাদের গণমাধ্যম কেন, সব জায়গায়াতেই একই চিত্র। যাদের মাঝ বরাবর থেকে কথা বলা উচিত তারা বরাবরই খেলার বিবরণ লেখার মতন নিজ পছন্দকে জারি রেখে কাজটা করে গেছেন। যারা আজকে ২০২৭ এর মেগা প্রকল্পের কিস্তি নিয়ে মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা করছেন। তাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে একটা রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের হাতে হারিকেন ধরিয়ে দেয়ার অভিযোগ। এখন অনেকের মুখে শুনছি রাষ্ট্র সংস্কারের কথা। অথচ তারা যা কিছু সংস্কারের কথা বলছেন, তা নষ্টের কারিগরির অনেকটা তাদেরই। যে গাছের গোড়ায় পানি ঢেলেছেন ফলের আশায়, সেটা যে বিষবৃক্ষ তা এখন টের পাচ্ছেন তারা। সেই টের পাওযার ধরণটা হচ্ছে ‘কভু আশীবিষে দংশেনি তারে’ ধরণের। অর্থাৎ ছোবল খাওয়ার আগে তাদের কাছে সে বিষ ছিলো অমৃত। এখন ‘সকলি গরল ভেল’। এই মানুষগুলো শুধুমাত্র নিজ মতাদর্শের কারণে বিষকে বিষ বলতে পারেননি। অন্যের মৃত্যু দেখেছেন, তাও তাকে বিষ মানেননি। যখন নিজের শরীরে বিষের জ্বালা অনুভব করতে শুরু করেছেন তখনি বলছেন সেটা বিষ। এর আগে সেই ব্রাজিল জেতার কাহিনী। ব্রাজিলের বিজয়ের চেয়ে রক্ষণভাগ ভাঙ্গার ব্যর্থতাই তাদের চোখে পড়েছে। তাদের মুখে ছিলো সেই হতাশার গল্প। প্রথমার্ধে হতাশ করেছে তিতের শিষ্যরা। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সৌদিআরবের সাথে হারের পর, একপক্ষ আর্জেন্টিনার শুধু দোষ গেয়ে গেছে। আরেকপক্ষ হারার বিকল্প কারণ খুঁজতে বসে গেছেন।

দেশের প্রথম শ্রেণির একটি দৈনিক ইসলামী ব্যাংক নিয়ে দারুণ একটা রিপোর্ট করেছে। চমৎকার অনুসন্ধানী কাজ। তাদের রিপোর্টের শিরোনাম অনুযায়ী ‘ভয়ংকর নভেম্বর’ যে কতটা ভয়ংকর, রিপোর্টটির বিষয় মাথায় রেখে সামগ্রিক চিন্তা করলে বুঝতে খুব একটা কষ্ট হয় না। কিন্তু সেই প্রতিবেদনেও বলার মতন ফাঁক রয়ে গেছে। একটা ব্যাংক যাকে কয়েক বছর আগেও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ব্যাংক হিসেবে বলা হতো, তার এই করুণ পরিণতি কেন হলো সেই কথাটাই ইচ্ছা-অনিচ্ছায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে সেই প্রতিবেদনে। এখানেও খানিকটা সেই ব্রাজিলের বিজয় বর্ণনার মতনই অবস্থা। প্রায় জায়গাতেই তাই। সে কারণেই একই যাত্রার দুই ফল দেখা যায়। এক ফলের শিরোনামে লেখা হয়, ‘ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে দেশ’, আরেক ফলে, ‘চারিদিকে অগ্নিসন্ত্রাস’। ব্রাজিলের বিজয়ের প্রতিক্রিয়াতেই বলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাতে ব্রাজিল সমর্থকরা আনন্দ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে অনেকেই একে ‘বাধভাঙ্গা উচ্ছাস’ বলে উৎসাহিত করেছেন। বিপরীতে আরেকপক্ষ বলছেন,‘ উচ্ছাসের নামে মানুষের রাতের ঘুম হারাম করা হচ্ছে’। কি, এক যাত্রায় দুই ফল নয়?

এতো গেলো সমর্থকদের কথা। কিন্তু যারা খবর লিখেন, সমালোচনা করেন, তাদের থাকতে হয় মাঝ বরাবর। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার সৎসাহস থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তা অনেকটাই উল্টো। কেউ সাদাকে কালো বানাতে ব্যস্ত, কেউ কালোকে সাদা। হালের কথাই ধরুণ, একপক্ষ বলছে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভয়াবহ। ব্যাংকে টাকা নেই, রিজার্ভ তলানিতে। আরেকপক্ষ বলছে, সব ঠিক আছে, এগুলো গুজব। ব্যাংকে যথেষ্ট টাকা আছে, রিজার্ভও ভালো। এখানেও সেই সমর্থনের প্রভাব। সেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কাহিনী। কিন্তু তারপরেও অল্প কিছু মানুষ প্রথম থেকেই সত্যটা বলে আসছিলেন। ওই যে ‘কভু আশীবিষে দংশেনি যারে’ তাদের অনেকেই সেই সত্যটাকে নজরআন্দাজ করে গেছেন। বিষের জ্বালা অনুভব করার পর এতদিনে বলতে চাইছেন, সেটা বিষ। অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের কথাও মানুষ নিতে পারছে না। কারণ কদিন আগেই বলেছেন, সব ঠিক আছে। যদিও জানতেন, ‘থালাটাও ভাঙাচোরা, বাটিটাও লিক আছে’ তবুও বলেছেন, ‘ঠিক আছে’। এখন হঠাৎ বলছেন, ‘লিক আছে’, সুতরাং এমন জনদের কথায় মানুষের বিভ্রান্ত হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার সেই ‘অসময়ের মেহমান’ হয়ে উঠেছেন তারা। কিন্তু অসময়ে অর্থাৎ সময় গেলে তো সাধন সহজ নয়, লালন তাই বলে গেছেন।

এই বিভ্রান্তি, এই যে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড এটা ভয়াবহ। এই ‘দো-দিল বান্দা, কালেমা চোর’দের কারণে সৃষ্ট এমন বিভ্রান্তি একটি রাষ্ট্র এবং জাতিকে বিপর্যয়ের সমুখে নিয়ে যেতে পারে। খোদ বিপ্লবও ভুল হয়ে যেতে পারে। হতে পারে বিপ্লবীরা বিপথগামী। মানুষ বঞ্চিত হতে পারে বিপ্লবের সুফল থেকে। হাল সময়ে দাঁড়িয়ে নব্বইয়ের গণভ্যুত্থানের দিকে নজর দিলেই আমরা তার সত্যতা বুঝতে পারি।

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ব্রাজিল

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1517 seconds.